প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগে সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খায়— কোন পণ্যের দাম বাড়বে? আর বাজেট উপস্থাপনের পর গুগলে সবচেয়ে বেশি সার্চ হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে থাকে— বাজেটে কোন পণ্যের দাম কমল, মোবাইলের দাম বাড়বে কি, সিগারেটের দাম কত হলো? ইত্যাদি।
১১ জুন (বৃহস্পতিবার) ঘোষিত হতে যাওয়া বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরেও একই ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। যদিও বাজেট ঘোষণার আগে নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয় কোন পণ্যের দাম বাড়বে বা কমবে, তবে অতীতের বাজেট, বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং শুল্ক-কর নীতির আলোকে একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরা যায়।
বাজেট আর পণ্যের দামের সম্পর্ক কী?
সরকার যখন কোনো পণ্যের ওপর শুল্ক, ভ্যাট বা সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করে, তখন সাধারণত সেই পণ্যের বাজারমূল্য বেড়ে যায়। অন্যদিকে কর কমানো হলে পণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে বাস্তবে শুধু বাজেট নয়, আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে:
সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য
বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি করা হয়। জনস্বাস্থ্য রক্ষার যুক্তিতে সরকার এই খাতে কর বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করে থাকে। ফলে এবারের বাজেটেও সিগারেটের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিলাসপণ্য
বিদেশি প্রসাধনী, দামী ঘড়ি, ব্র্যান্ডেড ব্যাগ, উচ্চমূল্যের ইলেকট্রনিকসসহ বিলাসপণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানো হতে পারে। এর উদ্দেশ্য সাধারণত রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিরুৎসাহিত করা।
আমদানিনির্ভর ইলেকট্রনিক পণ্য
যদি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্যের কাঁচামাল কিংবা আমদানির ওপর কর বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে। বিশেষ করে সম্পূর্ণ আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রভাব বেশি দেখা যায়।
কোমল পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ দেখিয়ে চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের পণ্যের ওপর কর সমন্বয়ের আলোচনা প্রায়ই দেখা যায়।
যেসব পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকতে পারে
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য
চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্যের ক্ষেত্রে সরকার সাধারণত মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর চেষ্টা করে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব এবং সরবরাহ সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
কৃষিপণ্য
কৃষি উৎপাদন উৎসাহিত করতে সরকার প্রায়ই কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বা কর-সুবিধা দিয়ে থাকে। ফলে কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সরাসরি বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকে।
মোবাইল ফোনের দাম কি বাড়বে?
বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে মোবাইল সংযোজন শিল্প গড়ে ওঠায় সরকার অনেক সময় স্থানীয় উৎপাদকদের সুবিধা দিয়ে থাকে। তবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত মোবাইল ফোন আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ানো হলে বিদেশি ব্র্যান্ডের ফোনের দাম বেড়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে কিছু সুবিধা দেওয়া হলে নির্দিষ্ট কিছু মডেলের দাম স্থিতিশীলও থাকতে পারে।
গাড়ির বাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে?
গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন হলে সরাসরি এর মূল্য প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে— ব্যক্তিগত গাড়ি, হাইব্রিড গাড়ি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, মাইক্রোবাস। এসব খাতে কর সমন্বয় হলে বাজারে নতুন মূল্য নির্ধারিত হতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য কী গুরুত্বপূর্ণ?
বাজেট ঘোষণার পর শুধু সংবাদ শিরোনাম দেখে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ— সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়ে না। কর বৃদ্ধির প্রভাব বাজারে আসতে কিছু সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করেন। সরকারি নজরদারিও বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
বাজেটের পর কী করবেন?
প্রয়োজনীয় পণ্যের নতুন মূল্যতালিকা সম্পর্কে সচেতন থাকুন। বড় ধরনের কেনাকাটার পরিকল্পনা থাকলে বাজেট-পরবর্তী বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করুন। গুজবের ভিত্তিতে অতিরিক্ত পণ্য মজুত করবেন না। বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসরণ করুন।
উল্লেখ্য, জাতীয় বাজেট শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করে। বাজেটের প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রা, ক্রয়ক্ষমতা এবং ব্যয়ের ওপর পড়ে।
তাই বাজেট ঘোষণার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক তথ্য জানা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা। কোন পণ্যের দাম বাড়বে বা কমবে, তা নির্ভর করবে সরকারের চূড়ান্ত করনীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত— বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আগ্রহ থাকবে তাদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় কতটা বাড়ছে বা কমছে।
মুক্তিসরণি/ডেস্ক
মুক্তিসরণি ডেস্ক