পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস আমাদের সবারই কমবেশি জানা। কিন্তু প্রকৃত এই ঘটনা থেকে গেছে ধোঁয়াশাতেই। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছরে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মারফতে দেশবাসী অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে—এই হত্যাকাণ্ড কারা, কেন, কীভাবে ঘটিয়েছিল।
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের যে নাটক মঞ্চস্থ করেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার, তা যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত—তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় এসেই পার্শ্ববর্তী দেশের পরিকল্পনামাফিক বাংলাদেশের প্রতি পরিকল্পিত এই ধাক্কাই তৈরি করে স্বৈররাজত্ব কায়েমের পথ। সেদিন বিডিআর সদর দপ্তরের দরবার হলে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার মাধ্যমে এই দেশের যে বিপুল ক্ষতি সাধিত হয়েছে, এতে কোনো দেশপ্রেমিকের সন্দেহ থাকবার কথা নয়। বাহান্নর ভাষা সংগ্রাম ও একাত্তরের রক্তে রঞ্জিত স্বাধীনতা যে বাংলাদেশের ইতিহাস, সেই ইতিহাসকে বারংবার কুক্ষিগত করে রেখেছে ভারতীয় আগ্রাসন। এতে যারপরনাই সঙ্গ দিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ।
তৎকালীন সময়ে ২৫ ফেব্রুয়ারির বিডিআর বিদ্রোহের ঠিক আগের দিন হঠাৎ করেই বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করে তোলে। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় আমদানি-রপ্তানিতেও। এ ঘটনা থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—তাহলে কি ভারত জানত পরদিন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো ঘটনা ঘটছে? তথাপি বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কমিশন গঠন করলে, সেই তদন্তেও স্পষ্টভাবে উঠে আসে ভারতীয় সম্পৃক্ততার কথা। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের অব্যাহত আগ্রাসনের কারণে বাংলাদেশ কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। গুটি কয়েক ভারতীয় দালাল ব্যতীত ভারতের অব্যাহত পানি, বাণিজ্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সাংস্কৃতিক ও সীমান্ত আগ্রাসনসহ নানান আগ্রাসনের কারণে দেশবাসী মনে করে ভারত কখনো বাংলাদেশের বন্ধুপরায়ণ সৎ প্রতিবেশীর পরিচয় দিতে পারেনি।
স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার যে চক্রান্ত, ধাপে ধাপে সে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন চলছে।
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় নির্মম হত্যাকাণ্ড সেই ষড়যন্ত্রেরই অন্যতম উদাহরণ। এই চক্রান্তের অংশ হিসেবে বিডিআর বিদ্রোহের নাটক মঞ্চস্থ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিডিআর—এই দুই বাহিনীকে দুর্বল করে দিতে সক্ষম হয়েছে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্তরের এতগুলো কর্মকর্তাকে একসঙ্গে হত্যা কোনো কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মেধা ও সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। অপরদিকে যে বিডিআর বাহিনী স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘ বছর ধরে অতন্দ্র প্রহরীরূপে সীমান্তে বিদেশি আগ্রাসন সফলভাবে প্রতিহত করেছে, সেই বাহিনীটির অস্তিত্ব মুছে দিতে সক্ষম হয়েছে এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। সেই ঐতিহ্যবাহী বিডিআর এখন বিজিবি নাম ধারণ করেছে। আর সীমান্তে জোরদার হয়েছে ভারতীয় বিএসএফের আগ্রাসন।
ফেলানী থেকে শুরু করে এখনো নির্বিচারে চলছে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড। আর ভারত নিচ্ছে পৈশাচিক আনন্দ। পিলখানা হত্যাকাণ্ড ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ঠান্ডা মাথার ষড়যন্ত্র। এটিকে ভারতীয় প্রতিশোধও বলা চলে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে ভারত সরাসরি এই পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের কি বন্ধু করে চলা যায়? বর্তমান বিএনপি সরকার যেভাবে ভারতকে প্রাসঙ্গিক করে তুলছে, এতে কি ধরে নেওয়া যায় যে এই দেশে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার আদৌ সম্ভব? অথবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব? বিশ্লেষকদের মতে, সবশেষ শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচারেও ভারতের হস্তক্ষেপ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিগত ১৬–১৭ বছর পর যে তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে উঠে এলো পিলখানা হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য, এর বিচার নিশ্চিত করবে তো বর্তমান বিএনপি সরকার? নাকি পুরোনো রাস্তায় হাঁটবে—তা এখন দেখার অপেক্ষায় পুরো জাতি।
অপরদিকে বর্তমান প্রজন্ম বলছে—সাতচল্লিশ, বাহান্ন, একাত্তরের ধারাবাহিকতায় যে চব্বিশ জাগ্রত হয়েছে, সেই চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশ কখনোই বিচারহীনতার বাংলাদেশ হতে পারে না।
মুক্তিসরণি/এমএস
নিরব রায়হান