ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

ঢাকার বাতাস কি বাসযোগ্য থাকছে?

ঢাকার বাতাস কি বাসযোগ্য থাকছে? ছবি: সংগৃহীত
ad728

কংক্রিটের জঙ্গল আর কালো ধোঁয়ার আস্তরণে ঢাকা এখন এক তপ্ত কড়াই। ক্যালেন্ডারের পাতায় মে মাস মানেই কালবৈশাখীর শীতল পরশ হওয়ার কথা থাকলেও, গত কয়েক বছরে দৃশ্যপট বদলেছে আমূল। প্রখর রোদ আর অসহনীয় গরমে জনজীবন এখন ওষ্ঠাগত। আবহাওয়া দপ্তরের উপাত্ত বলছে, গত এক দশকের তুলনায় গড় তাপমাত্রা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। কিন্তু কেন ঢাকা শহর তার শীতলতা হারিয়ে এক 'আরবান হিট আইল্যান্ড' বা উত্তপ্ত দ্বীপে পরিণত হলো? এই প্রতিবেদনে সেই উত্তর খুঁজছে মুক্তিসরণি


সবুজের হাহাকার ও জলাশয় বিনাশ

একটি আদর্শ শহরের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের চিত্র ভয়াবহ। স্যাটেলাইট ইমেজ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঢাকার মাত্র ৫ শতাংশেরও কম এলাকায় এখন সবুজ গাছপালার অস্তিত্ব রয়েছে।


এক সময় ঢাকাকে বলা হতো খাল ও পুকুরের শহর। অথচ গত দুই দশকে উন্নয়নের নামে ভরাট করা হয়েছে শত শত জলাশয়। জলাশয়গুলো প্রাকৃতিকভাবে তাপমাত্রা শোষণের কাজ করত। এখন সেই খালি জায়গা দখল করে নিয়েছে বহুতল ভবন, যা মাটির আর্দ্রতা কেড়ে নিয়ে বাতাসকে আরও শুষ্ক ও তপ্ত করে তুলছে।


কাঁচের ভবন ও এসির দহন

আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর দোহাই দিয়ে ঢাকা শহরে কাঁচঘেরা ভবনের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এই কাঁচের দেয়ালগুলো সূর্যের তাপ শোষণ না করে উল্টো প্রতিফলিত করে রাস্তায় ও পার্শ্ববর্তী পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়।


এর সাথে যুক্ত হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির অবাধ ব্যবহার। ভবনের ভেতরে ঠান্ডা বাতাস দিলেও এসির বাইরের ইউনিটগুলো ক্রমাগত উচ্চমাত্রার গরম বাতাস রাস্তায় ছাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় শুধুমাত্র এসি ও যানবাহনের ধোঁয়ার কারণে আশপাশের গ্রাম বা মফস্বলের চেয়ে তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি অনুভূত হয়।


জনস্বাস্থ্যে অশনিসংকেত

অসহনীয় এই উত্তাপ কেবল অস্বস্তি নয়, বরং বয়ে আনছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন এবং দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা হাসপাতালে বাড়ছে। বিশেষ করে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক এবং ছিন্নমূল মানুষের জন্য ঢাকার এই বাতাস এখন বিষফোঁড়া। বায়ুদূষণের সূচকেও ঢাকা প্রায়ই বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় থাকছে, যা ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।


বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (BIP)-এর মতে, ঢাকাকে বাঁচাতে হলে প্রথাগত চিন্তার বাইরে আসতে হবে। তাদের প্রস্তাবনায় উঠে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক:


ভার্টিকাল ফরেস্ট্রি ও ছাদ বাগান: ভবনের ছাদে বা দেয়ালে বাগান করা এখন আর শৌখিনতা নয়, বরং ঘরের তাপমাত্রা ৪-৫ ডিগ্রি কমাতে এটি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।


কংক্রিট ফুটপাথের বিকল্প: পানি শোষণ করতে পারে এমন 'পারমিবল পেভমেন্ট' বা ছিদ্রযুক্ত ইট ব্যবহার করা।


জলাশয় উদ্ধার: বিদ্যমান খাল ও লেকগুলো দখলমুক্ত করে সেখানে কৃত্রিম ফোয়ারা ও ছায়াযুক্ত এলাকা তৈরি করা।


গণপরিবহন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ: ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে ইলেকট্রিক বাস বা গণপরিবহন উৎসাহিত করা, যাতে কার্বন নিঃসরণ কমে।


বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। যদি এখনই জলাশয় রক্ষা ও বৃক্ষরোপণে কঠোর আইন এবং গণসচেতনতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে আগামী কয়েক বছরে ঢাকা কেবল তপ্ত নগরী নয়, বরং বসবাসের অযোগ্য এক জনপদে পরিণত হবে। সময় এখন পরিবর্তনের, অন্যথায় প্রকৃতির প্রতিশোধ হবে আরও ভয়াবহ।


মুক্তিসরণি/এমএস