ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

বাজেট ২০২৬-২৭: মধ্যবিত্তের জন্য সুখবর নাকি নতুন চাপ?

বাজেট ২০২৬-২৭: মধ্যবিত্তের জন্য সুখবর নাকি নতুন চাপ?
ad728
বাংলাদেশে জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় মধ্যবিত্ত শ্রেণির সবচেয়ে বড় আগ্রহ থাকে করমুক্ত আয়সীমা কত নির্ধারণ করা হয়েছে এবং করনীতিতে কী পরিবর্তন এসেছে। কারণ নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভর করে যারা জীবনযাপন করেন, তাদের জন্য সামান্য কর পরিবর্তনও মাসিক বাজেটে বড় প্রভাব ফেলে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, মূল্যস্ফীতির বর্তমান চাপ বিবেচনায় করমুক্ত আয়সীমা সামান্য বাড়ানো হতে পারে, তবে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকতে পারে। ফলে কিছু মধ্যবিত্ত সামান্য স্বস্তি পেলেও সামগ্রিক কর কাঠামোতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়

মধ্যবিত্তের ওপর বাজেটের সবচেয়ে দ্রুত ও দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে বাজারে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন এবং বাসা ভাড়ার মতো খাতে যেকোনো শুল্ক বা ভ্যাট পরিবর্তন সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি খরচের ওপর নির্ভরশীল হলেও বাজেটের নীতি এসবকে আরও প্রভাবিত করে। একইভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে গিয়ে পড়ে। ফলে মধ্যবিত্তের কাছে বাজেট মানে মাস শেষে খরচ কত বাড়ল তার একটি নতুন হিসাব।

চাকরিজীবী মধ্যবিত্তের বাস্তবতা

মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ চাকরিজীবী হওয়ায় বাজেটের প্রভাব তাদের জন্য আরও সংবেদনশীল। সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো থাকলেও মূল্যস্ফীতি বাড়লে বাস্তব আয় কমে যায়। বাজেটে সরাসরি বেতন বৃদ্ধি সাধারণত ঘোষণা করা না হলেও ভাতা, কর ছাড় বা কিছু প্রণোদনার মাধ্যমে আংশিক সুবিধা দেওয়া হয়। তবে বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় না বাড়লে মাস শেষে সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে চাকরিজীবী মধ্যবিত্তের জন্য বাজেট সবসময়ই এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি। কিছুটা স্বস্তি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে চাপ থেকেই যায়।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ ব্যয়ের চাপ

মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় একটি অংশ ব্যয় করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। সন্তানের স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ এবং কোচিং ফি প্রতি বছরই বাড়ছে। একইভাবে বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ওষুধের খরচও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজেটে যদি এই খাতে ভর্তুকি বা সরকারি সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ে, তাহলে মধ্যবিত্তের ওপর দীর্ঘমেয়াদে চাপ আরও বাড়তে পারে। এই কারণে বাজেটকে শুধু বর্তমান ব্যয়ের দিক থেকে নয়, ভবিষ্যৎ ব্যয়ের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা জরুরি।

মুদ্রাস্ফীতি ও বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা

মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে বড় অদৃশ্য চাপ হলো মুদ্রাস্ফীতি। কারণ আয় একই থাকলেও যখন পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বাজেটে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য যদি কর বৃদ্ধি করা হয় বা আমদানি ব্যয় বাড়ে, তাহলে বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে কাগজে-কলমে আয় বাড়লেও বাস্তবে জীবনযাত্রার মান তেমন উন্নত না-ও হতে পারে। এই কারণেই অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মধ্যবিত্তের জন্য বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় বাজেট ঘোষণার কয়েক মাস পর বাজার পরিস্থিতি দেখে।

সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট মধ্যবিত্তের জন্য একদিকে কিছু স্বস্তির বার্তা দিতে পারে, আবার অন্যদিকে নতুন চাপও তৈরি করতে পারে। করমুক্ত আয়সীমা সামান্য বাড়লেও দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় যদি সমানভাবে বাড়ে, তাহলে সেই সুবিধা খুব বেশি কার্যকর হয় না। তাই মধ্যবিত্তের জন্য বাজেটের আসল প্রভাব বোঝা যাবে পরবর্তী সময়ের বাজার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে।

মুক্তিসরণি/ডেস্ক